ভলতেয়ার, কাঁদিদ

ভলতেয়ারের কাঁদিদ: ক্ষমতার নৈরাজ্য ও আশাবাদিতার বাসনা ভেদ
জাহেদ সরওয়ার

 

”  যখন সব কিছুরই খারাপ দশা, তখন সব কিছুকে ভাল বলার বাতিক হল আশাবাদভলতেয়ার

ক্লাসিক বইগুলোর মাহাত্ব্য এখানেই যে বইগুলো চিরনবীনা। সব সময় এদের আবেদন একরকম। অনন্ত অপরিবর্তনীয় এদের প্রয়োজনীয়তা। জগতের চিরকালিন সমস্যাগুলোকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করে দুই মলাটে। ভলতেয়ার মশাইয়ের কাঁদিদ নামের পুস্তকটিও এরকমই চিরনবীনা একটি বই। যার আবেদন কখনো শেষ হবার নয়। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৭৫৯ সালে জেনেভায়। ‘খোদার সৃষ্টি এই জগত সব জগতের সেরা, খোদার ইচ্ছায় সবই ভালর জন্য ঘটছে’ জর্মন দার্শনিক  লাইবনিৎস এর এই আশাবাদি তত্ত্বকে আক্রমন করার জন্য বইটি লিখলেও সক্রাতেস এরিস্তেলেসসহ পৃথিবীর তাবৎ আশাবাদি দার্শনিকদের জন্য বইটি বিরাট প্রশ্নচিহৃ হয়ে আছে।

কাঁদিদ যখন প্রথম প্রকাশিত হয় ভলতেয়ারের অন্য অনেক বইয়ের মতই গ্রন্থকারের কোনো নাম ছিলনা। বইটির নামের নীচে লেখা ছিল শুধু ‘ডক্তর রালফ-এর মুল জর্মান থেকে অনুদিত এবং মিনডেন-এ ১৭৫৯ খ্রীস্টাব্দে তাঁর পকেটে পাওয়া আরো কিছু রচনাংশ সহযোগে পরিবর্ধিত। (১৭৫৯) কিন্তু বইটি প্রকাশিত হবার সাথে সাথে প্রায় পাঠকরা বুঝতে পারে এ ধরণের লেখা একমাত্র ভলতেয়ারের কলম থেকেই বেরুনো সম্ভব। সুইস সরকার বইটি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। বই পোড়ানো বা বইলেখার কারনে নির্বাসন এগুলো ভলতেয়ারের জীবনে নতুন কিছু না। মাত্র বাইশ বছর বয়সে রাজা পঞ্চদশ লুইকে নিয়ে বেনামে ব্যঙ্গ নাটক লেখার কারনে সন্দেহজনকভাবে তাকে ফ্রান্সের এক জায়গায় নির্বাসিত করা হয়। পরে আবার চতুর্দশ লুইকে নিয়ে লেখা এক কবিতার জন্য তাকে নিক্ষেপ করা হয় বাস্তিল কারাগারে। বাইশ বছর বয়স থেকে সেই যে শুরু হল চুরাশি বছর বয়স অবদি নির্বাসন কারাগার আর বই পোড়ানো তাকে ছাড়েনি।

সবসময় ক্ষমতাবানদের বিরোধিতা করেছেন। নির্বাসন আর জেল ছিল তাঁর জীবন। তিনি বলতেন দূর্ণীতিপরায়ন রাষ্ট্রে সৎ মানুষের একমাত্র বাসস্থান কারাগার।

এই বইটিতে তিনি মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর পুরো ইউরোপকে পটভূমি ও বিষয়বস্তু করেছেন। যদিও এটাকে ফিকশন বলা হয়, মূলত মানুষের বোধ্য করে তিনি দর্শন লিখেছেন। শুধু লাইবনিৎস নয়,পৃথিবীর  যে সব আশাবাদী দার্শনিক সক্রাতেস, এরিস্তেলেস আর ধর্মগ্রন্থসমূহ এমনকি ভারতীয় গীতা উপনিষদেও  যে সবকিছু সবসময় সবচেয়ে ভালর জন্য ঘটে। এ আশাবাদি তত্ত্ব কাঁদিদকে শিখিয়েছিল তার দর্শনগুরু প্লাঁগস। ব্যারণ কন্যাকে ভালবাসা আর চুমু খাওয়ার অপরাধে রাজদরবার থেকে পাছায়  লাথি দিয়ে কাঁদিদকে বের করে দেবার পর  সে বেরিয়ে পড়ে পৃথিবীর পথে। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে কাঁদিদের নিয়তি তাকে তাড়িয়ে  বেড়ায়। কিন্তু সবখানেই কাঁদিদ দেখল জানোয়ার সুলভমানুষ হিংস্রতা, প্রতারণা নিষ্ঠুরতা দখলদারিত্ব নারীধর্ষন খুন যুদ্ধ। এই সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সে জানতে পারে পৃথিবীতে সব কিছু ঘটে সবচাইতে খারাপ হবার জন্য কারণ প্রাণী হিসাবে মানুষের স্বভাবে গলদ আছে। অন্যান্য জীব থেকে মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক আলাদা কিন্তু অদ্ভুতভাবে মানুষের এই বুদ্ধিমত্তা সবসময় নিয়ন্ত্রন করেছে আত্মসুখ বা স্বার্থপরতা। মানবজাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে বিরাট হতাশার ভেতর নিক্ষেপ করেন ভলতেয়ার পাঠককে। জেস্যুটদের ভন্ডামী, তথাকথিত আত্মাহীন সাহিত্যিকদের ছলনা, দার্শনিকদের ভ্রান্তি সব নিজের মতো প্রায় অকাট্য যুক্তি দিয়ে তিনি পরাজিত করেন। এই কাহিনির বিভিন্ন চরিত্রের অভিজ্ঞতার বর্ণনার ছলে তিনি পৃথিবী সম্পর্কে তার মতামত ব্যক্ত করেন।

জাহাজে ভ্রমণের সময় ওলন্দাজ দস্যুদের হাতে সবকিছু হারানো মারত্যাঁ নামের এক বৃদ্ধ কাঁদিদের প্রশ্নের উত্তরে পৃথিবী সম্পর্কে বলেন ‘এই ভূগুলিকা যখন আমি নিরীক্ষণ করি,তখন আমার মনে হয় ভগবান একে কোনো অশুভ সত্তার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। আমি এমন শহর কদাচিৎ দেখেছি যে প্রতিবেশী শহরের ধ্বংশ কামনা না করে, এমন পরিবার কদাচিৎ দেখেছি যে আর এক পরিবারকে নিশ্চিহৃ করতে না চায়। সর্বত্র দুর্বল সবলকে ঘৃণা করে এবং তার পদলেহন করে, আর সবল দুর্বলকে মনে করে ভেড়া, যার লোম ও মাংস বাজারে বিকোয়’।

ত্রয়োবিংশ পরিচ্ছেদে ফ্রান্স থেকে ইংলন্ডের উপকুলে এসে কাদিদ মারত্যাঁকে জিজ্ঞেস করে ‘আপনি কি ইংল-কে জানেন? তখন মারত্যাঁ বলল ‘ সে এক অন্য ধরনের পাগলামি। আপনি জানেন এই দুই জাত কানাডা অঞ্চলে কয়েক বিঘা বরফ-ঢাকা জমির জন্যে লড়াই করেছে এবং চমৎকার লড়াইয়ের জন্যে তারা কানাডার যা দাম তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করেছে’। কাদিদ বইটির বয়স ২৫০ বছর হতে চলল। কিন্তু উপরোক্ত বয়ান এখনো পৃথিবী সম্পর্কে কত সত্য। যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া মানব স্বভাবের যেন আর কোন কিছুই পরিবর্তন হয়নি।

কাঁদিদকে জিজ্ঞেস করে তার ভৃত্য তাহলে আশাবাদ মানে কি? কাঁদিদের উত্তর, সবকিছু খারাপ থাকা অবস্থায় যে বলে সবকিছু ভাল চলছে সে হলো গিয়ে আশাবাদী।

কত সত্য কথা আমাদের দেশের সরকারগুলোর দিকে তাকালে বুঝা যায়। দেশের চরম দুর্দিন বাজারে আগুন বেড়েই চলে জিনিসপত্রের দাম,সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভেজালে ঠাসা, মূল্য লাগামহীন কোন নিয়ন্ত্রন নেই, কোন মনিটরিংও নেই, ক্ষমতাসীনদের ভাষ্য কোনো সমস্যা নেই। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, রাস্তাঘাট নেই, মানুষের খাদ্য নাই, চিকিৎসা নাই,  সে অবস্থাতেই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রচারের বাকসোগুলোতে ঘোষণা করা হয় উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে চলেছে  দেশ। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই সরকার তার মন্ত্রিসভা,  সরকারি কর্মচারি ও সরকারের পোষ্য বুদ্ধিজীবিরা খুব আশাবাদি। তারা সবসময় আশাবাদিতার ওপর পত্রিকার পাতায় পাতায় প্রবন্ধ লিখে জীবন ধারন করে। এই সব আশাবাদিদের  সাক্ষাৎকারে সাক্ষাৎকারে সয়লাব পত্রিকাগুলো। এইসব পেশাদার বুদ্ধিজীবিদের সম্পর্কে ভলতেয়ার এক চরিত্রকে দিয়ে বলান ‘ ক্ষমতাবান আর তাদের ক্ষমতার নৈরাজ্যকে বৈধতা দিতে এরা পাদ্রি হিসাবে কাজ করে। ক্ষমতাবানদের গুণগান গেয়ে পত্রিকার পাতা ভরানোই এইসব পেশাদার লিখিয়ের কাজ’। ভলতেয়ারের প্রায় লেখার ভেতর এই সত্যটাকে পাওয়া যায়।

 

তার ‘ মাইক্রোমেগাস’ বইতে ভিন্ন গ্রহ থেকে এলিয়ানরা আসে পৃথিবীতে। অতিকায় এই গ্রহের বাসিন্দাদের শারিরিক কাঠামোও অতিকায়। একেকজনের উচ্চতা পাঁচ লক্ষ ফুট উঁচু। শূন্যপথে আসার সময় ও শনিগ্রহের থেকে এক লোককে তুলে আনে। তার উচ্চতা মাত্র কয়েক হাজার ফুট উঁচু। ভুমধ্যসাগর দিয়ে হাঁটবার সময় এলিয়ানটার পায়ের গোড়ালিটুকুই কেবল ভিজেছিল। সে শনিবাসিকে জিজ্ঞেস করে ‘তোমরা কত বছর বাঁচো’? শনিবাসিটা কাচুমাচু করে বলে সে কথা বলে আর লজ্জা দিয়েন না মহাশয়। আমাদের প্রায় জন্মের সাথে সাথেই মৃত্যু হয়। খুব কম সংখ্যক লোকই ১৫ হাজার বছরের বেশি বাঁচে’।  সাগরে হাটবার সময় এলিয়ানটা সমুদ্রে চলন্ত মানুষভর্তি এক জাহাজ সমুদ্র থেকে তুলে নিয়ে তার বুড়ো আঙ্গুলের ওপর রাখে। জাহাজের যাত্রীরা মৃত্যু সন্নিকট ভেবে দোয়াদরুদ পড়তে লাগল। পাঁচলক্ষফুটি আকাশের কালো মেঘের মত তার মস্তিস্কটি সামান্য নুয়ে জিজ্ঞেস করে। ‘ওহে পরমাণূবৃন্দ প্রভ’ তোমাদের মধ্যেই মনে হয় তার সৃষ্টির সেরা জ্যামিতিটা প্রকাশ করেছেন। তোমাদের আকার দেখে মনে হচ্ছে তোমরাই একমাত্র আনন্দের অধিকারি, প্রাণ দিয়েই তোমাদের এই ক্ষুদ্র দেহ গঠিত। মনে হয় তোমরাই পুর্ণাঙ্গ আত্মা। সত্যিকারের সুখের সাথে আমার কখনো মোলাকাত হয়নি। মনে হয় তোমাদের মধ্যেই তা বিরাজমান।

যাত্রীদের মধ্যে জনৈক দার্শনিক বলে উঠে ‘ মহাশয় এমন প্রচুর পদার্থই আমাদের মধ্যে আছে যা দিয়ে যতেষ্ট বদমাইশি করা যায়। আপনার জানা দরকার, এই মুহূর্তে আমি যখন আলাপ করছি, এই আমার মত হ্যাট মাথায় দেওয়া এক লক্ষ জীব অনুরূপ সংখ্যক স্বজাতীয় মাথায় হ্যাট পরা প্রাণীকে হত্যা করছে। ক্ষুদ্ধ এলিয়ান গর্জন করে উঠে ‘ বদমাইশ সব। আমার ইচ্ছা হচ্ছে আর দুই কদম চালিয়ে এই ইতরদের পায়ে পিষে মারি। দার্শনিকটি বলে ‘ দয়া করে আপনি আর এত কষ্ট স্বীকার করবেন না। তারা নিজেরাই অনেক পরিশ্রম করছে নিজেরাই নিজেদের হত্যা করবে বলে। বছর দশেক পরে এই শয়তানদের এক শতাংশও টিকবে কিনা সন্দেহ। এদের শাস্তি না দিয়ে বরং শাস্তি দেয়া উচিত ঐসব কুঁড়ে আর নিস্কর্মার ঢেকি বর্বরদের যারা নিজেদের সৈন্য পাহারায় প্রাসাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যার আদেশ দিয়ে থাকে আর পরে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে প্রার্থনাশালায় ধন্যবাদ দিয়ে থাকে ইশ্বরকে তাদের কামিয়াব করবার জন্য।

এই ধরণের অসাধারণ খোচা আর প্রতিবাদে সব লেখা গুলো ঋদ্ধ। ভলতেয়ার শুধু যে আশাহীনতার কথা বলেন তা কিন্তু না। এই বইতে তিনি এই আশাহীনতার ভেতর থেকে বেরুনোর একটা নৈতিক রূপরেখাও টানেন। তিনি এলদোরাদো নামের এমন এক ইউতোপিয়ার স্বপ্ন দেখান মানবজাতিকে, যেখানে পথের ধুলো হচ্ছে সোনা আর হীরা। এগুলো ছুঁয়ে দেখেনা এলদোরাদোর লোকজন। ও দেশে খেতে কোনো টাকা লাগেনা। মোটকথা আত্মিক শুদ্ধিময় এক কাল্পনিক রাজ্য এই এলদোরাদো। মঁসিয়ে ভলতেয়ার আজো মানবজাতি কোনো এলদোরাদো খুঁজে পায়নি এবং পৃথিবী সেই একই জায়গায় আছে। তেলের জন্য আমেরিকা এখনো ধ্বংস করে আফগান, ইরাক। হীরা সোনার জন্য লাতিন আমেরিকাকে নরক বানিয়ে রেখেছে সাম্রাজ্যবাদিরা। এ প্রসঙ্গে বার্ট্রা- রাসেল তার ‘মানুষেরকি কোন ভবিষ্যত আছে’ গ্রন্থে বলেন ‘ এই মুহ’র্তে পৃথিবীর সামনে সবচে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল : কারুর কাম্য কোনও কিছু যুদ্ধের সাহয্যে অর্জন করা কি সম্ভব? কেনেডি আর ক্র্রশ্চেভ বলছেনÑ হ্যাঁ সম্ভব। এই চুড়ান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির ব্যাপারে কেনেডি আর ক্রশ্চেভ একমত। তাঁরা যদি সাম্ভাব্যতার যুক্তিসম্মত বিচার করতে সক্ষম হতেন, তাহলে দুজনেই একমত হতেন, যে মানবজাতির নিশ্চিহৃ হওয়ার সময় এসে গেছে। কিন্তু মানবজাতির নিশ্চিহৃ হওয়ার ব্যাপারে তাঁদের কারুরই কোনো মাথাব্যথা নেই। অহমিকা ঔদ্ধ্যত্ব, মর্যাদাহানির আশঙ্কা এবং মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতা তাঁদের বিচারশক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। তাঁদের এই অন্ধত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে শক্তিশালী কিছু বেনিয়াগোষ্ঠীর পুঁজি যা রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত‘। এই রকম এক পৃথিবীতে আমাদের বাস। এখানে আশাবাদিতা এখন কত হাস্যকর।

ভলতেয়ারের এই পুস্তকটি পৃথিবীর এমন কোনো ভাষা নেই যে ভাষায় অনুবাদ হয়নি এবং পাঠক প্রিয়তা পায়নি। বাংলাভাষায়ও এটির দুটির অনুবাদ চোখে পড়ে। একটা প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা একাডেমি থেকে অন্যটা প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকে। মুল ফরাসি থেকে কবি অরুন মিত্র কৃত অনুবাদটা সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসযোগ্য এবং সহজপাঠ্য।

Read/Download Candide

CANDIDE by Voltaire – FULL AudioBook