মায়াবৃক্ষের মায়াকথন

কামরুল ইসলাম।

নাহিদা আশরাফী’র গল্পগ্রন্থ ‘মায়াবৃক্ষ’।রহস্যময় জীবনের নানাপীড়ন, নাগরিক সমাজের অভিঘাত, স্নেহ-প্রেম-ভালবাসার বিচিত্র অনুষঙ্গ, জীবন যাপনের কোমল সৌন্দর্য , বিষাদের নিবিড় বৈপরীত্য যেন মানবিক উপলব্ধির গভীর প্রত্যয়ে গল্পের বিষয়সমূহে সন্নিবেশিত । অভিনবত্বের নিবিড় আনন্দ-উজ্জ্বল অভিজ্ঞতা সুপরিস্ফুট গল্পে,  এ যেন অর্ন্তজগত ও অর্ন্তজীবনের অনুভবে উপলব্ধির বৈচিত্রময় প্রকাশ ।

গল্পের বিন্যাস সমাজের সাথে পরিবারের সংযোগ ও বৈপরীত্যে জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা অতি নিপুণতায় শব্দের অনুষঙ্গে উপস্থাপিত ।  এ যেন গল্পকারের শিল্প প্রতিভা ও সৃষ্টির অনবদ্য প্রকাশ । ‘আমার লেখক হয়ে ওঠার গল্প’ সত্যিই শিল্প প্রতিভার অভূতপূর্ব উন্মেষকে তিনি  চিত্রায়িত করেছেন । পরীক্ষার সময় বাইরে সাদা সাদা  বকের প্রতি দৃষ্টিমুগ্ধ অনুভূতি গণিতের খাতায় ছড়া আকারে লিখে রাখার কোমল উজ্জ্বল সৃষ্টিশীলতা জীবনের মুহূর্তগুলোয় পরিপূর্ণ হয়ে আছে । আর এই সৃজনশীলতার উদ্যমে বাবার অনুপ্রেরণা, মায়ের সাহিত্য অনুরাগ যেন পাথেয় ও আর্শীবাদ । তবু বাসনার অতৃপ্তি প্রতিমুহূর্ত প্রকৃতির বৈচিত্রের মতো ঐশ্বর্যময় করে তোলে তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে, কী কাব্যে, কী গল্পে, সর্বত্র ।

সমাজ ও পরিবার মিলেই রাষ্ট্র নামক ভূখণ্ডে ব্যক্তি মানুষের যাপিত জীবন, সেই জীবনে ‘অনুষঙ্গ পুরাণ,  একজন মিথ্যেবাদী মা ও তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক সন্তান , একটি অসমাপ্ত চিঠির গল্প, ডায়েরি, সহযাত্রী, হলুদ পাজ্ঞাবি, হাওলাদার সাহেবের বিশ টাকা, পার্সেল’ অভূতপূর্ব শৈল্পিক সংযোজন । ভিন্নতার মাত্রায় উদ্ভাসিত ‘এন্টিক’ নামক গল্পটি | অভিজাত বিপণীর বোতলজাত এন্টিক অদূর ভবিতব্যের দেশে পরিবেশ-প্রতিবেশকে প্রত্নতাত্ত্বিক অবয়বে বিজ্ঞানের ক্ষিপ্র সম্ভাবনায় উপস্থাপিত ।  আবার অন্যসব গল্পে পারিবারিক জীবনের কখনো সহজ সরল স্নেহ ভালবাসার চিত্র,  কখনো রাষ্ট্রের বৈষম্যজাত নাগরিক টানাপোড়েন, জীবনযুদ্ধ অতি নিঁখুতভাবে তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় । গল্পের চরিত্রসৃজনের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারী চরিত্র যেন গভীর মমতায় চিত্রায়িত । সেজন্যে দেখি রজ্ঞনা কিংবা রাহেলা, সুতপা, লক্ষ্মী, রাবু, দুলালের মা,  তহমিনা সমাজের নানা বৈচিত্র্যে, পরিবেশে স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্যে বাস্তব অনুষঙ্গে ফুটে ওঠে । চারপাশের চেনাজানা ঘটনার মাধ্যমে উপেক্ষিত নারীর জীবনকে প্রতিচিত্রায়িত করার কৌশল পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি করবে ।  একইভাবে কিশোর চরিত্র ও মায়ের নিবিড় অনুভূতি সহজাত প্রবৃত্তির পারঙ্গমে মায়াময় অনুভূতির তন্ময়তায় নিয়ে যাবে। পুরুষ আধিপত্য সমাজে নগর জীবনের ক্লেদ, চড়াই-উৎরাই পুরুষ চরিত্রে সার্থকভাবে রূপায়নের প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই  পাঠককে অভিভূত করবে। ভাষা ও শব্দের ব্যবহার জটিল নয়, বরং প্রচলিত শব্দের সুদক্ষ ব্যবহার ছোটগল্পে চমক সৃষ্টি করে এবং প্রকৃতির বর্ণিল ব্যবহার গল্পের চিত্রময়তার সৌন্দর্য আবহকে প্রফুল্ল দান করে । সূচনায় চকিত চমক, মধ্যে সহসা একমুখী তীব্র অনুভব, পরিণতি নাটকীয় – এ যেন তাঁর গল্পে ‘ শেষ হয়ে হইল না শেষ’-এর চিরন্তন অনুভূতি আলোকিত ব্যজ্ঞনায় পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে।  ‘মায়াবৃক্ষ’ গল্পগ্রন্থ সার্থকভাবে পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে – এ প্রত্যাশা করা যায় ।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s