মজিদ মাহমুদের কবিতার মণিমুক্তোমালা

বিনয় বর্মন

মজিদ মাহমুদের কবিতা আমাকে অপার আনন্দ দান করে, আমার অন্তরকে দীপ্তিময় করে। এর বহুবিধ কারণ রয়েছে। প্রধান দুটি কারণ হলো: শব্দশিল্পের মুন্সিয়ানা এবং অর্থদ্যোতনার গভীরতা। প্রথমটির অধিষ্ঠান কবিতার বহিস্তরে এবং দ্বিতীয়টির আবাসন কবিতার অন্তস্তরে। এ দুটি বৃহৎ গুণের সমন্বয় তার কবিতাকে মহৎ করে তোলে। তার কবিতাপাঠে প্রথমত কান তৃপ্ত হয় এবং দ্বিতীয়ত প্রাণ তৃপ্ত হয়। কানের তৃপ্তি আসে শব্দের ঝংকার থেকে এবং প্রাণের তৃপ্তি আসে ব্যঞ্জনার বিস্তার থেকে। শব্দছন্দের প্রবাহমানতা আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায় আনন্দময় নন্দনসাগরে এবং দার্শনিক বীক্ষা আমাদের চিন্তা-অনুভবকে ভরিয়ে তোলে মাঙ্গলিক জ্ঞানচ্ছটায়। মজিদ মাহমুদের কবিতা সৌন্দর্য ও শক্তিতে দেদীপ্যমান, অপরাভবের সাক্ষী। তার কবিতা পাঠে আমি, আমরা, ধন্য বোধ করি।
মজিদ মাহমুদের কবিতার বাচনভঙ্গিটি তার নিজস্ব। এটি কোনো ক্যাননের দাসত্ব করে না, যদিও তা ক্যাননকে প্রসারিত ও প্রভাবিত করে। তার কবিতার স্বচ্ছ ধারা মানবীয় উপলব্ধির তীর ঘেঁষে এঁকেবেঁকে চলে যায় জীবনের মহাসঙ্গমে। কবি শক্ত হাতে ধরে রাখেন নৌকার হাল; ঝড়-তিমিরেও তা কখনো দিকহারা হয় না। তার কবিতা না জীবনানন্দীয়, না রাহমানীয়। এখানে শব্দস্রোত পরাবাস্তবতার ধূসর কুয়াশায় নিমজ্জিত নয়, বরং তা জাগ্রত চেতনার সঙ্গী। এখানে বাকবিন্যাস নাগরিক জীবনের ক্লেদক্লান্তিতে আবিষ্ট নয়, বরং তা মহাবৃত্তে জীবের আস্তিত্বিক সংকটমোচনে প্রয়াসী। তার কবিতা তারই মতো দৃঢ়, হার্দ, যা অন্তরলোক ও বহির্লোকের দ্বান্দিকতায় বাণীঋদ্ধ। তার কবিতা জেগে থাকে প্রেমে ও অপ্রেমে, চিত্রে ও বিবৃতিতে, সংবেদন ও চিন্তাশীলতায়। কবিতা নিয়ে কবির সার্বক্ষণিক স্ট্রাগল:
কবিতা তোমাকে লিখছি – রাত্রি জেগে
রক্তধারা প্রবল বেগে – এই পর্বত দিগ্বিদিক
কার সন্ধান বুঝি না ঠিক
কোথায় যেন একটি কথা রয়েছে গোপন
কোথায় যেন হয়নি ধরা একটি ক্ষণ
এই অধরা হয়তো আমার কবিতা ঠিক।
(‘কবিতা’)
মজিদ মাহমুদ কল্পনার গল্পকথক। তিনি তার একেকটি কবিতা চিত্রায়িত করেন একেকটি অসাধারণ গল্পের পটভূমিতে। তার নিকটে গল্পের চেয়ে গল্পের প্রেক্ষাপটই মূখ্য। তাই গল্পের সঙ্গে তিনি তার গুরুত্ব ব্যখ্যা করেন। তিনি গল্প শোনান ঘোড়া ও কুকুরের (‘ঘোড়া ও কুকুর বিষয়ক রচনা’), সিংহের (‘স্বজাতি’), গোলাপের (‘গোলাপ না ফুটলে ভালো’), রঙগন্ধ সচেতন অন্ধবালকের (‘অন্ধবালক’), জমি ও কৃষকের (‘জমি ও কৃষক’), দুগ্ধবতী গাভীর (‘দুধ সমাচার’), দাদী ও ডালিমকুমারের (‘দাদী ও ডালিমকুমার’), ইঁদুর ও বিড়ালের (‘বিড়াল’) এবং নিউ ফাউন্ডল্যান্ডে জাহাজডুবির (‘3909 on’)। এসব গল্পের মধ্যে তিনি সঞ্চার করেন গভীর তাৎপর্য, যেখানে একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্য কথনের আধার হিসেবে কাজ করে।  আমরা ইলিশের গল্প শুনি: ‘লবন সমুদ্র পার হয়ে এইখানে মোহনার কাছে  / থেমে গেল ইলিশের মাতা, পোয়াতি মায়ের মতো আজ / সন্তানের কথা ভেবে তাই পরেছে সে নায়রের সাজ / কোথায় রয়েছে পড়ে সেই বাড়ন্ত দিনের ধাচে’ (‘ইলিশ’)। তিনি অবস্থান নেন তার নিজস্ব বোধের পক্ষে, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার কাছাকাছি। তিনি জীবন ও মরণকে ব্যাখ্যা করেন নতুন প্রজ্ঞালোকে:
মরণকে একটি পিচ্ছিল জিহ্বার মতো বিছিয়ে রেখে
আমাকে ধরার জন্য ছুটে চলেছ, আর আমি
প্রাণভোমরা একটি সিন্দুরের কৌটার মধ্যে লুকিয়ে রেখে
তোমার নাগাল থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি
এই পলায়ন একটি খেলা
যেহেতু সমুদ্রসঙ্গমের আগেই তোমার বিছানো
পিচ্ছিল জালের সূক্ষ্ম সুতায় গেঁথে নেবে আমাকে
যেহেতু আমার তর্জনীতে জড়ানো সৌরমণ্ডল
ঘুরতে ঘুরতে একদিন তোমার চারপাশে গড়ে তুলবে দুর্গ-পরিখা
তুমি ধরে ফেলবার আগেই
আমি সাড়ে সাতশ কোটি নিরাকার বল
তোমার চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়েছি
অসহায় বাঘিনীর মতো তুমি থাবা বিস্তার করে আছ
(‘বল উপাখ্যান’)
মানবপ্রকৃতি ও বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে কবি প্রত্যক্ষ করে এক গভীর আত্মীয়তা। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে যে রহস্য লুকিয়ে থাকে কবি তাকে আবিস্কারে উদ্বুদ্ধ হন। কবির পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে অদৃশ্য অণুজীব থেকে মহাজাগতিক নক্ষত্রপুঞ্জ। কবি বৃক্ষের সঙ্গে মিশে যান, লাভ করেন বৃক্ষজনম: ‘আমার দেহের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি গাছ / আমি বললাম গাছ রে তুই আমার সখা’ (‘পাদপ-প্রেয়সী’)। কবি বৃক্ষের সুখদুঃখ নিয়ে ভাবেন:‘আজ রাত ভোর হলে আমার গাছজীবন শেষ হয়ে যাবে / কাঠুরিয়া এসেছিল কাল রাতে, সব ঠিক হয়ে গেছে / করাত কলের শব্দে আমার রাত্রির ঘুম ভেঙে যাবে’ (‘গাছজীবন’)। বৃক্ষশাখায় বাস করে বিহঙ্গকুল, বৃক্ষ তাদের মায়ের মতো আশ্রয় দেয়। বৃক্ষ নিধনে পাখিরা হয় নিরাশ্রয়। সংবেদনশীল কবিমন কিভাবে তা সহ্য করে? ‘একটি গাছ কর্তন মানে অসংখ্য পাখিহত্যা / বৃক্ষ তো বিহঙ্গের মা …. গাছ কাটা গেলে মানুষ জাগতে পারবে না’ (‘বিহঙ্গের মা’)।
প্রকৃতির স্নিগ্ধতাকে কবি ধারণ করেন হৃদয়গভীরে, যদিও তিনি ঠিক প্রকৃতিবাদী কবি নন। তিনি প্রকৃতির শোভা দেখেন দু’চোখ ভরে, প্রকৃতির গান শোনেন কান পেতে। প্রকৃতি কখনো তাকে ক্লান্ত করে না, হনন করে না। তাকে পুলকিত ও জাগ্রত রাখে সদাসর্বদা। প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ এসে ধরা দেয় পংক্তিমালায়। ‘আমার সাধনা বৃক্ষের পল্লব / আমার সাধনা আকাশের বিশালতা / অমিত জল পূর্ণতোয়া নদী / উড়ন্ত বিহগের ভাসমান ডানা’ (‘সাধনা’)। অনূঢ়ার বেশে বর্ষা তাকে বিমোহিত করে। ‘বাদলে গিয়েছে ডুবি একখানি ঘর / অবিরাম বারিপাত নীল নীলাম্বর / বাদলের কন্যা ঠিক বড় অসহায় / বুকের গহীনে দিই বরষাকে ঠাঁই’ (‘বরষা মেয়ের নাম’)। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হন। ‘নদীকে ভালোবাসি যতখানি দেখেছি তার বিস্তার / নদীর সৌন্দর্য তার পানি, স্রোতোস্বিনী, গভীরতা / কোথা থেকে এসেছিল কোন প্রাগৈতিহাসিক কালে / কোনদিন পারব কি যেতে তার উৎসমূলে?’ (‘নদী’)। কবি তার নিজের কবিতা সম্পর্কে আস্থাশীল। চাটুকার পাঠকের বদলে তিনি চান প্রকৃত পাঠক, প্রকৃতিপাঠক:
নির্বোধ কবি খোঁজে নির্বোধ কবিতায় শ্রোতা
আমার কবিতা পড়ে বিহঙ্গ নদী মাঠ দিগন্ত নীরবতা।
(‘কবি’)
কবি কখনো কখনো নস্টাকজিক হয়ে ওঠেন। ফিরে যান গ্রামে, শৈশবের দিনগুলোতে। ছুটে বেড়ান শস্যক্ষেতে, সাঁতরে বেড়ান পুকুরে কিংবা নদীতে। কবির স্মৃতি-রোমন্থন: ‘ধানকাটার আগে যে সব জলের জারজ / আমাদের দেখাতো ভয় / তাদের বুকের উপর পাল তুলে আমরাও চলে গেছি দূরে / নানাদের বাড়ি, মাছ ধরে খেয়েছি স্রোতের টানে’ (‘আমাদের গ্রাম’)। অনেকদিন পর গ্রামে এসে দেখতে পান ‘মায়ের কবরে গজিয়েছে ঘাসের দঙ্গল / সাপখোপ নিয়েছে আশ্রয়’ (‘গ্রামে ফেরা’)। তার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে তালগাছের ছবি। ‘একটি তালগাছের স্মৃতি আমার হৃদয়ে জেগে আছে / আমাদের পুবের ঘর ঘেঁষে ছিল সে দাঁড়িয়ে / গ্রাম থেকে যারা কাজের খোঁজে বেরিয়ে যেত সকালে / সন্ধ্যায় তালবৃন্তের আহ্ববানে ফিরে আসত তারা’ (‘তালগাছ’)। কিংবা কোনো আমগাছ বা বেতসগাছ তাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়:
এই আমগাছটা, যার প্রতিবিম্ব
আমাকে ছুঁয়েছিল প্রথম
ঝাড়বাতি জ্বেলেছিল
বেতস বনের জোনাকি
এখানে জননী প্রসব করেছিলেন
তার প্রথিত বিশ্বাস
(‘স্মৃতির যাতনা’)
মজিদ মাহমুদ মিথের বিনির্মাণকারী। ভারতীয়-আরবীয়-ইউরোপীয় মিথকে তিনি জীবন্ত করে তোলেন তার মসিস্পর্শে। ‘আমার গুরু দ্রোণাচার্য’ কবিতায় তিনি একলব্য হিসেবে গুরুকে এড়িয়ে চলেন। তিনি তৈরি করেন প্রমিথিউসের নতুন ভাষ্য; দেখান আদি মানব-মানবীর আপেল কাহিনীর নতুন চিত্রায়ন। তিনি মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের আলোকে আধুনিক বাস্তবতার নির্যাস সিঞ্চন করে তৈরি করেন তার মাহফুজামঙ্গল। তার ধ্যান-অনুধ্যানের মাধুরিমানবীকে নিয়ে তিনি মেতে থাকেন সারাক্ষণ। ‘তোমার নাম অঙ্কিত করেছি আমার তছবির দানায় / তোমার স্মরণে লিখেছি নব্য আয়াত / আমি এখন ঘুমে-জাগরণে জপি শুধু তোমার নাম’ (‘কুরশিনামা’)। শব্দে শব্দে চুঁইয়ে পড়ে তীব্র আবেগের, কামনাবাসনার, বিরহযাতনার ঘনরস। হৃদয়ের স্পন্দন স্পষ্ট হয়ে ওঠে ধ্বনিতে-ধ্বনিতে:
মাহফুজা আমার বিপরীতে ফিরায়ো না মুখ
যেন কোনদিন বঞ্চিত না হই তোমার রহম
সারাক্ষণ আমাকে ঘিরে থাকে যেন তোমার ক্ষমা
তুমি বিমুখ হলে আমাকে নিক সর্বহারী যম
তাহলেই খুশি হব বেশ তুমি জেনো প্রিয়তমা
তুমি নারাজ হলে বেড়ে যায় আমার অসুখ।
(‘মাহফুজামঙ্গল’-তিন)
মাহফুজাকে নিয়ে মগ্নতার রেশ যেন কাটে না। মাহফুজামঙ্গলকে কবি সম্প্রসারিত করেন উত্তরখণ্ডে। কবি মাহফুজার স্মৃতিচারণ করেন, তাকে দেখেন নদীর প্রবাহে, পাহাড়ের পাদদেশে, নিঃসঙ্গতায়, বিষকাঁটায়, খরগোসের ঠোঁটে, জলস্রোতে, মাছের পোনার ভিড়ে, আগুন সংরক্ষণের প্রযুক্তিতে, কঙ্কালের শিসে, দুধের নহরে, জহরযন্ত্রণায় ও মৃত্যুর উৎসবে। তারপর আবার তিনি ফিরে আসেন: ‘এবার আমি ফিরে যাচ্ছি মাহফুজা / তোমার সেইসব স্মৃতির সম্পদের ভেতর / যার ছায়া ও শূন্যতা আমাকে দিয়েছে / অনন্ত বিশ্বাস’ (‘ফিরে যাচ্ছি’)। মাহফুজার আকাশতলে পরিব্রাজকের মতো হাঁটতে হাঁটতে বুদ্ধের মন্ত্র হয়ে ওঠে কবির শেষ কবিতা:
মাহফুজা এবার আমি ত্যাগ করেছি চীবর আর পিণ্ডপাত্রে আকাঙ্ক্ষা
মাহফুজা এবার আমি ত্যাগ করেছি ওষুধ ও শোয়াবাসনার তৃষ্ণা
মাহফুজা এবার আমি ত্যাগ করেছি শরীর ও মনের যাবতীয় কামাশ্রয়
মাহফুজা এবার আমি ত্যাগ করেছি সংহার ও মাংসের লিপ্সা….
মাহফুজা এবার আমি গ্রহণ করেছি ধর্মং শরণং গচ্ছামি
মাহফুজাং শরণং গচ্ছামি
নির্বাণ শরণং গচ্ছামি
(‘মাহফুজাং শরণং গচ্ছামি’)
মজিদ মাহমুদের অনেক কবিতাই দেশ ও সমাজ ভাবনায় নিষিক্ত। ‘খাঁটি বাঙালি’ কবিতায় কবির দেশাত্মবোধের পরিচয় মেলে। তার আক্ষেপ, বাঙালি এখন বাঙালির শত্রু, বাঙালি এখন বাঙালির শোষক। তিনি এ অবস্থার অবসান চান: ‘কিভাবে আমরা মুক্তি পাবো স্বজাতির পীড়ন থেকে / হয়তো রক্ত বিশুদ্ধ হতে / খাঁটি বাঙালি হতে আরো লাগবে কয়েক শ বছর।’  কবি ভাবেন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার কথা। ‘আমি এক মুক্তিযোদ্ধাকে চিনি / যুদ্ধে যার একটি পা খোয়া গেছে’ (‘মুক্তিযোদ্ধা’)। আগে সেই মুক্তিযোদ্ধা দেখে তিনি ব্যথিত বোধ করতেন, এখন ভাবেন এক পা-ই বরং সামনে এগুনোর জন্য ভালো। তার উপলব্ধি:‘দুপায়ে ভর দেওয়া মানুষ কোথাও যেতে পারে না / মুক্তিযোদ্ধাকে তো অনেকদূর যেতে হবে’। ‘আহত মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে’ কবিতায় তিনি লিখেন: ‘প্রকৃত সৈনিকের আঘাত পৃষ্ঠে লাগে না।’ তার মন আপন সংস্কৃতি ও মাটিকে আঁকড়ে থাকে: ‘আমি জানি কবিতা ফিরে এলেই আসবে / মুকুন্দরাম কালকেতু ফুল্লরা / কবিতা এলেই বৈকুণ্ঠের গান গাবে চণ্ডিদাস / কবিতা এলেই অশ্বত্থের তলে জানুনত হবে গৌতম’ (‘কবিতা ফিরে আসবে’)। শিল্পচর্চার সময় কবি অভাবী মানুষের কথা বিস্মৃত হন না। ‘এই যে এখানে আমি দাঁড়িয়েছি, মজনু / তোমার রিক্ততা আমাকে দাও / আমি তো ছেড়েছি এক পোয়া আটার অভাব’ (‘মজনুর কাছে প্রার্থনা’)। তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক চিন্তা ধারণ করে আছে ‘মধ্যাহ্নভোজ’, ‘স্টক এক্সচেঞ্জ’, ‘কাগজের নোট’, ‘ওয়ান ইলেভেন’, ‘আমার মার্ক্সবাদী বন্ধুরা’, ‘রবার্ট ফিস্কের প্রতিবেদন’, ‘আমেরিকা’, ‘কসোভো আমার বাংলাদেশ’, ‘নিষিদ্ধ কবিতাগুচ্ছ’ ইত্যাদি কবিতা। ছেলেভুলানো ছড়ার ঢঙে তিনি শব্দমাটিতে গুঁজে দেন সমাজচিন্তার বীজ:‘ফুসমন্তর ফুস / দেশে আবার বর্গী আসবে ফিরে / ঘুমাও বাছাদন / জাগবে না কিছুতেই’ (‘বর্গীর গান’)। চারপাশের প্রতিকূল অবস্থা দেখে কবি অসহায় বোধ করেন, শরণাপন্ন হন গৌতম বুদ্ধের:
অশথের তলে জানু পেতে বসেছি গৌতম
হে বোধি, হে বৃক্ষ, সুমতি দাও!
আমার মাথার পরে উড্ডীন হাইড্রো-শকুন
এটমের মণ্ডপে পূজার মালা
(‘আবার গৌতম’)
মজিদ মাহমুদের উচ্চারণ স্পষ্ট, তীক্ষ্ণ ও অন্তর্ভেদী। তার শন্দচয়ন ও বাক্যশৈলি বিশেষ যত্নপ্রসূত যা কবিতাকে শিল্পমানোত্তীর্ণ করে তোলে। তিনি রাতের একখণ্ড দৃশ্যের বর্ণনা করেন এভাবে: ‘যখন মাঝরাতে তোমার শরীর থেকে খুলে পড়ে কোলাহল’ (‘সাব এডিটর’)। গদ্যছন্দ ও পদ্যছন্দ উভয় ছন্দেই তিনি সাবলীল। কবীরের শত দোঁহা ও দিওয়ান-ই-মজিদ-এর ছন্দের দোলা আমাদের মনকে আন্দোলিত করে, দিওয়ানা করে। তার এ দুটি গ্রন্থভুক্ত কবিতায় কেবল্ ভক্তিরসের সন্ধানই মেলে না, তার সঙ্গে আমরা লক্ষ করি, হিন্দু ও ইসলামি প্রথা-গাথার সমন্বয়বাদিতা, যা তার সামগ্রিক কাব্যদর্শনের বিশিষ্টতার প্রতীক। ‘নানা সুর তালে সরোদ বাঁশি / বাঁজিতেছে দেখ কাঁসারি ঢাক / ইসরাফিলের সিঙ্গার ফুঁকা / দুনিয়াটা আজ রসাতলে যাক’ (‘মহানৃত্য’)। আবার ধাত্রী ক্লিনিকের জন্মভুক্ত গদ্যকবিতাগুলো আমাদেরকে শক্ত মাটির ওপর হাঁটার অভিজ্ঞতা দান করে। সত্যের উন্মোচন ঘটে পংক্তিতে পংক্তিতে। ‘আমার জন্মদিন হয়ে গেছে জন্মের আগে’ (‘জন্মদিন’)। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি দেখেন, মাটির তৈরি পুতুলের বুকেও থাকে ওড়ার বাসনা: ‘যদিও তাদের বুকে ছিল উড়বার সাধ / মাটির পুতুল তাই আমরা দেখতে পাইনি’ (‘পুতুলপাখি’)। কবির দেখার দৃষ্টি অন্যরকম:
এক চোখ অন্য চোখকে দেখতে চায়
পারে না, নাক জেগে থাকে মাঝখানে
(‘চোখ’)
মজিদ মাহমুদের কাব্যিক সত্যের উদ্ভাসনে থাকে উইট, থাকে আয়রনি। যেমন, ‘সন্তান ধারণ সতিই এক অসুখ / এ রোগ কেবল নারীদের হয়’ (‘পাঁঠা ও ডাক্তার’)। তিনি পাশাপাশি বসিয়ে দেন ‘একাকী রমনী ও চতুষ্পদ কবি’কে (‘কুকুর’)। জন্মকে দেখেন তিনি ‘পর্যটনের শুরু’ হিসেবে, যা এক আশ্চর্য সত্য (‘যাত্রার প্রথম গান’)। ‘যুদ্ধে আমি প্রতিপক্ষকে হারতে দেই না / তাই বন্ধুরা বলে আমার সঙ্গে খেলার আনন্দ নেই’ (‘বিজেতারা হাসতে পারে না’)। ‘লোভের মতো একটি সম্পদ তাও তোমার নেই / বলো লোভ ছাড়া কি মানুষ হলো’ (‘সিদ্ধার্থ’)। তার কবিতায় থাকে অক্সিমরন ও কন্ট্রাডিকশনের চমৎকারিত্ব। ‘ভালোবাসা এক ঘরহীন ঘরের নাম’ (‘অলৌকিক বেদনা’)। ‘আনন্দ তোমার নাম লিখেছি বেদনার অক্ষরে / তোমার স্বাস্থ্য ভাল থাকুক’ (‘আনন্দ’)। তিনি একদিকে যেমন প্রয়োজনমত তৎসম-তদ্ভব-বিদেশি শব্দ ব্যবহার করেন, অন্যদিকে কবিতার মধ্যে গ্রামীন শব্দ ঢুকিয়ে দেন অবলীলায়। যেমন, তার কবিতায় একদিকে পাওয়া যায় ‘গোষ্ঠ’, ‘অনুপ্রভা’, ‘মূষিক’, ‘পক্ষিমাতা’, ‘গজেন্দ্রগমন’, ‘দ্রাক্ষাগ্রথিত’, ‘মকরাক্ষ’, ‘কুম্ভিরাশ্রু’, ‘লোধ্ররেণু’, ‘কুজ্ঝটিকা’, ‘নৃমুণ্ডধারিণী’, ‘আনপ্রিডিক্টেবল’, ‘দাইসেলফ’, ‘পার্টিক্যাল’, ‘হরিজন্টাল’, ‘অটোমোবাইল’, ‘ভ্যাকুয়াম’, ‘এক্সিডেন্ট’, ‘হাইরাইজ’, ‘মনুমেন্ট’, ‘অ্যাবসলুট’, ‘প্লাসেন্টা’, ‘এসাইলাম’, ‘স্টারভেশন’, ‘গ্লোরিফাই’, ‘প্রোলেতারিয়েত’, ‘মুসাফির’, ‘পয়দায়েশ’, ‘মুদ্দাফরাশ’, ‘কুরশিনামা’ ইত্যাদি শিক্ষিত শব্দ, অন্যদিকে পাওয়া যায় ‘পোলাপান’, ‘পাছা’, ‘পোঁদ’, ‘মাগি’, ‘ছিনালি’, ‘হারামজাদা’, ‘লক্কর ঝক্কর’, ‘কুঁইকুঁই’, ‘হাগামুতা’, ‘তেঁদড়’ ইত্যাদি আটপৌরে শব্দ। কখনো তিনি লিপ্ত হন আত্মবিদ্রূপে; নিজেকে তিনি আখ্যায়িত করেন ‘বকি’ (কবির উলটো) বলে এবং নিজের কবিতাকে ‘বাক্য’ (কাব্যের উলটো) বলে। এগুলোতে মিশে থাকে সূক্ষ্ম হাস্যরস, যার ঘাটতি হয় না তার অন্য কবিতায়ও:
অর্জুন গাছ জড়িয়ে ধরলে ব্লাডপ্রেসার কমে
অর্জুনের ছাল হৃদরোগের মহৌষধ
এমন একটা গাছকে আমি বিয়ে করতে চাই
বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেলে
রক্তের চঞ্চলতা বেড়ে গেলে
যে আমাকে আলিঙ্গন করবে
(‘অর্জুন’)
ইতিহাস, কিংবদন্তী, ধর্মতত্ত্ব ও অধিবিদ্যার জ্ঞানপীঠে তৈরি হয় মজিদ মাহমুদের কবিতার শরীর ও আত্মা। তবে সবকিছুতেই কাজ করে এক আধুনিক মানুষের বোধ যা তার অনুসন্ধিৎসু আধ্যাত্মিক চেতনার অংশ। তার ইতিহাস দর্শনের স্বরূপ: ‘মানুষের ইতিহাস একের পর এক রাজা বদল / বর্গী এসে সব লুট করে নেয় / রক্তের গঙ্গার মধ্যে ফুল বিকশিত হয় / ভক্তের ফুল শুকিয়ে যায়, দলিত হয় পায়ের নিচে’ (‘এখন দার্শনিক কবিতা লেখার সময়’)। তিনি জড়বাদ ও চৈতন্যবাদের দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা করেন: ‘তোমার ধারণা জীবে না জড়ে / তোমার আছে কী বৃদ্ধি বা ক্ষয় / তোমার আসন বাইরে না ঘরে / এসব কথা শিশু আর মূর্খরা কয়’ (‘মূর্খ’)। তিনি কবিতা লিখেন শবেবরাত নিয়ে, দোজখে নিক্ষিপ্ত এক আলেমকে নিয়ে। ‘প্রভু যিশুর তিনটি বাণী’ কবিতায় তিনি আক্ষেপ করেন বর্তমান পৃথিবীতে প্রেম ও করুণার অভাব নিয়ে। ‘ঈশ্বর আমাকে বাঁচতে দেননি’ কবিতায় তার উচ্চারণ তীর্যক: ‘তবু তোমাদের ঈশ্বর আমার পিতা / আপন পুত্রকে যিনি দিয়েছেন দাসত্বের শৃঙ্খল।’ ‘পুতুল পূজক’ কবিতায় তিনি অদৃশ্য ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্মের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন: ‘আজ মনে হয়, তুমিও ব্যস্ত নিত্যনতুন পুতুল বানাতে / আর আমি তোমার পুতুলের সমঝদার / হয়ে গেছি পুতুল পূজক।’ ঈশ্বরকে নিয়ে সংকটও হাজির হয় কখনো কখনো:
তুমি বলো ঈশ্বর আছে আমি বলি নেই
দুজনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো এতেই
আমার সাথে তাই রয়ে গেলো তোমার ঈশ্বর
তুমি শুধু ছেড়ে গেলে আমার এই ঘর।
(‘ঈশ্বর’)
কবি তার দিব্যদৃষ্টি দিয়ে জগতকে প্রত্যক্ষ করেন এবং গভীর সত্য উচ্চারণ করেন হোমারের মতো, টাইরেসিয়াসের মতো। এই সত্য কাব্যিক সত্য, দার্শনিক সত্য। একই সঙ্গে যৌক্তিক ও আনুভাবনিক। ‘মৃত্যু চাইলে আগে জন্মাতে হবে / আগে মৃত্যু, পরে জীবন – এমন হয় না’ (‘মৃত্যুমেহন’)। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আলোয় তিনি দেখেন মৃত্যুর ছায়া: ‘ভোরের তরুণ অরুণের ললাটে লেগেছিল সন্ধ্যার বিষাদ / সেই শোক বুকে নিয়েই সূর্য জ্বেলে গেল আলোর মশাল / যদিও দিনের কোলাহল শেষে তুমি শবযাত্রার অতিথি শুধু’ (‘আবহমান’)। প্রাণিজগতের অঙ্গকৌশল নিয়ে কবির অপার বিস্ময়: ‘বিহঙ্গমানুষ কবে তুমি ডানা পেলে / দুপায়ে হাঁটার কসরত বড় ম্যালা’ (‘সমুদ্র দেখার পরে’)। কবি দেখেন, চিন্তা করেন এবং অভিনব সিন্ধান্তে উপনীত হন। পা থেকে হাতের বিবর্তন নিয়ে তার কাব্যতাত্ত্বিক প্রস্তাবনা:
হাত হলো মানুষের শুকিয়ে যাওয়া পায়ের নাম
শিশুকে মজা দেখাবার জন্য প্রথমে সে পিছনের
পায়ে দাঁড়িয়েছিল একদিন

শিশুর ফিকফিক হাসি আর বারংবার বায়নার কাছে
দুপায়েই টলমলে লাফিয়ে চলতে হলো কিছুক্ষণ….
সেই থেকে মানুষের জাত প্রাণিকুল থেকে আলাদা হয়ে গেল….
মানুষের ইতিহাস হলো হাতের ইতিহাস।
(‘হাত’)
মজিদ মাহমুদ কবিতা নিয়ে নিরীক্ষা করেন। তিনি মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ নিয়ে কবিতার ল্যাবরেটরিতে ঢোকেন এবং উৎপন্ন করেন সিংহ ও গর্দভের কবিতা এবং অণুবিশ্বের কবিতা। অন্যত্র তিনি প্রগলভ, কিন্তু এখানে তিনি শব্দে মিতব্যয়ী। কতো কম কথায় কতো বেশি বলা যায় এখানে সেটাই আরাধ্য। গুরুগম্ভীর বিষয়কে তিনি সহজ ভাষায় ব্যক্ত করেন শৈল্পিক দক্ষতায়। তার অণুবীক্ষণে তৈরি হয় অণুপংক্তি, বর্ণিল অনুভাবনার অনুরণন। আমরা তার কয়েকটি অনুপংক্তি পাঠ করি: ‘যে সব কীট শুঁয়োপোকা সরীসৃপ / আমার চারপাশে রয়েছে অবহেলায় / তাড়ায়ও না ওদের – থাকুক যত্নে / ওরাই তো আমার সঙ্গী শেষ বিছানায়’ (‘সঙ্গী’)। ‘ঈশ্বরের নাম জপার সময় তো আমি / মৃত্যুর পরেও পাবো / আগুন কিংবা উদ্যান – সবই ঈশ্বরের মহিমা / তবে যে-সব নশ্বর বস্তুনিচয় হারিয়ে যায় নিত্য / আপাতত আমাকে করতে দাও তাদের মহিমা প্রকাশ’ (‘নশ্বর’)। এসব কবিতায় একটি বৈঠকি ভাব ও শের-শায়েরির ভঙ্গি আছে, যা মনকে আন্দোলিত করে। মানুষ একা আসে, একা চলে যায় – আপাতদৃষ্টিতে এটাই সত্য মনে হয়। কিন্তু কবির উপলব্ধি ভিন্নরকম:
পৃথিবীতে কেউ একা আসেনি
আবার কেউ একা যাবেও না
কিছু মানুষ তাকে সঙ্গে করে এনেছিলো
কবর কিংবা চিতায় নিয়ে যাবে তারা।
(‘একা’)
মজিদ মাহমুদ নন্দনের গভীরে ডুব দিয়ে তুলে আনেন হরেক মণিমুক্তোমালা, যা আমাদের কাব্যভুবনকে সমৃদ্ধ করে। বল উপাখ্যান, আপেল কাহিনি, গোষ্ঠের দিকে, ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম, সিংহ ও গর্দভের কবিতা, ভালোবাসা পরবাসা, মাহফুজামঙ্গল ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ তার টাকশালে সঞ্চিত অমূল্য রতন। তিনি আদ্যপান্ত কবিতার মানুষ। কবিতামালার উপক্রমনিকারূপে লিখিত তার ভাষ্য হয়ে ওঠে এক অনন্যসাধারণ কবিতা। ‘এই কবিতাগুলি আমি। আমার সময়। আমার দেশ ও মহাকাল। … এই কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল সপ্ত-আকাশের উপরে, এই কবিতাগুলো পতিত হয়েছিল সহস্র পাতালের নিচে, … এই কবিতাগুলো নিজেই লিখিত হয়েছিল, এই কবিতাগুলো সবাই মিলে রচনা করেছিল। এই কবিতাগুলো কেউ শুরু করে নাই, এই কবিতাগুলো কেউ শেষ করতে পারবে না। এই কবিতাগুলো ছাড়াই এই কবিতাগুলো পাঠ করা যাবে। যা লেখা হয়েছে সেগুলোও এই কবিতার অংশ, যা লেখা হবে সেগুলোও, এমনকি – যা লেখা হয় নাই, সেগুলোও এই কবিতার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।’  কী দুর্দান্ত এক কাব্যজগতের কারিগর তিনি!